Homeব্লগসংখ্যাগরিষ্ঠের প্রভাব ও অর্থশালীর প্রতিপত্তি শেষ কথা নয়

সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রভাব ও অর্থশালীর প্রতিপত্তি শেষ কথা নয়

নিয়ন্ত্রিত আবেগ ও অনুভূতি যুক্ত প্রতিষ্ঠান ন্যায়পরতার ভরসা

গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা, অধিকার ও সাম্যের মত, ন্যায়ের আদর্শ একান্তভাবে অপরিহার্য। কিন্তু ন্যায় এর সংজ্ঞা কী তা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ আছে। কারণ সমাজের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের ধ্যানধারণা, মূল্যবোধ, সামাজিক সচেতনতা প্রভৃতির ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের সাথে ন্যায় এর ধারণাগত ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ঘটেছে । স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে ন্যায় এর ধারণা ভিন্ন।

 

‘জাস্টিনিয়ান ইনস্টিটিউটের’ মতে ন্যায় হল সঠিক, সাধারণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার একটি মানসিক অনুভূতি ও সদিচ্ছা। ন্যায় বলতে বোঝায় নিরবিচ্ছিন্ন ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরস্পরের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়া। এখন প্রশ্ন হলো এই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব কার, সমাজে বসবাসকারী মানুষের, রাষ্ট্রের, নাকি দেশীয় বা আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের?

 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যায় শব্দটিকে বিশ্লেষণ করে নানা ধরনের ন্যায়ের কথা বলেছেন। এগুলি হল আইনগত ন্যায়, রাজনৈতিক ন্যায়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়। আমার মতে প্রতিটি ন্যায় কে প্রতিষ্ঠা করতে সমাজে বসবাসকারী মানুষ, রাষ্ট্র ও দেশীয় বা আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের নিজ নিজ ভূমিকা আছে। যেহেতু সমাজ নিয়ে গঠিত রাষ্ট্র, ও রাষ্ট্রসমূহ নিয়ে গঠিত বিশ্ব, এবং রাষ্ট্র ও বিশ্ব ন্যায় অনুসারে যে আইন তৈরি করে, সেই আইন অনুসারে ন্যায় প্রদান করার দায়িত্ব থাকে দেশীয় বা আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের হাতে। এই সকল প্রতিষ্ঠান হলো স্বাধীন, নির্ভীক ও নিরপেক্ষ।

 

একুশ শতকের কিছু ঘটনাসমূহ এই স্বাধীন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের উপর কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

ন্যায়পরতা কি আবেগ-অনুভূতি দ্বারা চালিত হচ্ছে নাকি সংখ্যাগরিষ্টের প্রভাব ও অর্থশালীর প্রতিপত্তি তা নিয়ন্ত্রণ করছে? এখানে ঘটনাসমূহের উল্লেখ প্রয়োজন।

প্রথম দৃষ্টান্ত ভারতের মতো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ১৫২৮-২৯ খ্রিস্টাব্দে, মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের সেনাপতি ‘মীর বাকি’ বাবরি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায়। ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে বাবরি মসজিদের মূল গম্বুজ এর নিচে গোপনে রামের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

babri masjid ajoddha
বাবরি মাসজিদ, পুরনো চিত্র।

১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়। শেষ পর্যন্ত মামলা পৌঁছায় ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে। আদালত ঘোষণা করে এই মামলা দেখা হবে জমি বিবাদ মামলা হিসেবে। অবশেষে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ ই নভেম্বর সর্বোচ্চ আদালতের ৫ সদস্যের বেঞ্চ রায় দেন যে, মসজিদ তৈরি করতে অযোধ্যায় অন্যত্র ৫ একর জমি দেবে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার। যে জমিতে বাবরি মসজিদ ছিল সেখানে রাম মন্দির তৈরীর জন্য কেন্দ্র একটি প্রকল্প তৈরি করবে।

১০৪৫ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়েছে, আদালতে বিশ্বাস বা আস্থার ভিত্তিতে জমির মালিকানা ঠিক করে না। প্রমাণের ভিত্তিতে ঠিক করে। এই কথার সঙ্গে কাজ, ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রায়ের পর অনেকেই অসহমত পোষণ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন কোর্ট কি তথ্যের থেকে বিশ্বাসকেই বেশি গুরুত্ব দিল?( বলাবাহুল্য যে কোন বিবাদকে জিইয়ে রাখার পক্ষপাতী আমি নই)

 

দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত টি হল-

তুর্কির মত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের যেখানে ‘হাইয়া সোফিয়া’ মিউজিয়াম কে পুনরায় মসজিদে রূপান্তরিত করার ঘটনা। ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট ‘জাস্টিনিয়ান’ ‘হাইয়া সোফিয়া’ নামক চার্চটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি সে সময়ের ‘কনস্টান্টিনোপল’ ও বর্তমানে ‘ইস্তানবুলে’ অবস্থিত।

hagia sofia turky
হাইয়া সোফিয়া, তুর্কী

১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে কনস্টান্টিনোপল ‘অটোমান’ সাম্রাজ্যের দখলে চলে আসে। ‘অটোমান’ সাম্রাজ্যের সম্রাট মেহমেদ ‘সোফিয়া চার্চ’কে মসজিদে পরিণত করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে কামাল পাশা আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুর্কি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৩৪ সালে তিনি ‘হাইয়া সোফিয়া’ মসজিদ কে মিউজিয়ামে রূপান্তরিত করেন, এবং ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো ওয়র্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা পায়।

বর্তমানে তথা ২০২০ খ্রিস্টাব্দে জুলাই মাসে তুর্কির সর্বোচ্চ আদালত রায় প্রদান করে যে, ১৫০০ বছরের পুরনো ‘হাইয়া সোফিয়া’ মিউজিয়াম থেকে মসজিদে রূপান্তর করন। সে ক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে বিচার ব্যবস্থা কি সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রভাব এর কাছে হার মানল?

 

তৃতীয় দৃষ্টান্ত হলো-

আফ্রিকান ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্ট এর উপর পক্ষপাতিত্বের দোষারোপ। উল্লেখ্য ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ই জুলাই রোম ষ্টাটিউট চুক্তি হয়, এবং এই চুক্তির দ্বারাই  ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই কারণে ১৭ ই জুলাই বিশ্ব জুড়ে আন্তর্জাতিক ন্যায় দিবস পালিত হয়।

 

এই তিন ভিন্ন ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক ন্যায়ালয়ের করুণ দশার চিত্র। যে প্রতিষ্ঠানকে আমরা জানি তার নিয়ন্ত্রিত আবেগ-অনুভূতি যুক্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে, তা কি সত্যিই সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রভাব, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তির কাছে মাথা নত করছে?

 

আমরা যদি ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করে এই বিশ্বকে আধুনিক গৌরবের যুগ হিসেবে তুলে ধরতে চাই, তাহলে একথা বলতেই হয় যে, নিরবিচ্ছিন্ন ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরস্পরের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়া উচিৎ। তার সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব ও বিত্তশালীদের প্রতিপত্তি ন্যায় ব্যবস্থাকে যাতে পরিচালনা না করে যথার্থ সহযোগিতা করে সে বিষয়ের ওপর দৃষ্টিপাত করা উচিৎ। কারণ সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায় সুনিশ্চিত করার একমাত্র ভরসা হলো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহ।

 

লিখেছেন- গোলাম সামসুজ্জোহা

এই মুহূর্তে