আমাদের কি দেশের কাছে কিছু পাওয়ার অধিকার নেই?

migrant workers on road outline
‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ লিখিত সংবিধান ও গণতান্ত্রিক দেশ আমার ভারতবর্ষ। যার প্রস্তাবনায় উল্লেখ আছে প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিক পদমর্যাদা ও সুযোগের সমতা পাবে।’
নিজস্ব মতামত, লিখছেন- গোলাম সামসুজ্জোহা 

“এতকাল নদীকূলে যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলই দিলাম তুলে থরে বিথরে
এখন আমায় লহো করুণা ক’রে”

 

সত্য বলতে আমি তোমার বেশি লেখা পড়িনি। কোন দিন তোমার সাহিত্যের সমুদ্রে নামতে পারবো কিনা জানিনা। কিন্তু পাঠ্যসূচি ছাড়া যেদিন প্রথম তোমার লেখা সোনারতরী কবিতাটি পড়েছিলাম পূর্ব আবেগ থেকে নতুন প্রকৃত ভালোবাসা জন্মেছিল। তোমার লেখাটা সম্ভবত কৃষক ও মহাজনকে নিয়ে ছিল বলে মনে হয়। বর্তমান কোভিড ১৯ অতিমারী ব্যাধির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে লেখাটির সীমা কৃষক থেকে ছাড়িয়ে শিল্প-শ্রমিক, মহাজন থেকে ছাড়িয়ে শিল্পপতি ও প্রশাসন পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে। এই ভয়ানক পরিস্থিতির সময় পরিযায়ী ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে। এই দুর্যোগের দিনে তাদেরকে সাহায্যকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি মনে করে যে তাদের প্রতি করুনা করা হচ্ছে তা হবে অমূলক। কারণ অতিমারীর পূর্বে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে কিংবা নিজের রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে রোদে, তাপে ও জলে ভিজে অপরিশ্রান্ত পরিশ্রমের দ্বারা তারা অর্থ শালীদের বানিয়েছে আরো বেশি অর্থশালী।

‘কোথাও শ্রমিকদের গায়ে ছেটানো হচ্ছে কীটনাশক, পায়ে হেঁটে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার অতিক্রম করতে গিয়ে মৃত্যু আবার ক্লান্ত হয়ে রেললাইনে শুয়ে থাকা অবস্থায় দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু।’

 

কিন্তু অতিমারীর কারণে দেশজুড়ে লকডাউন চালু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যহ খবরের শিরোনামে থাকছে পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশাগ্রস্ত ছবি। কোথাও শ্রমিকদের গায়ে ছেটানো হচ্ছে কীটনাশক, পায়ে হেঁটে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার অতিক্রম করতে গিয়ে মৃত্যু আবার ক্লান্ত হয়ে রেললাইনে শুয়ে থাকা অবস্থায় দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু। এই মৃত্যুজনিত খবর আমাদের প্রভাবিত করেনা তা বলা ভুল হবে, কখনো কখনো আমরা নিরুপায় আবার কখনও বেদনা জর্জরিত হয়ে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছি তবুও প্রশ্ন করা কি ছেড়ে দেওয়া যায়?

 

এখন প্রশ্ন হলো পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি আমাদের গৃহীত পদক্ষেপ কি করুনা, কর্তব্য পালন, নাকি দায়িত্ব পালন যদি করুণা বা কর্তব্য পালন হয়, তাহলে প্রথম ক্ষেত্রে সমাজের কাছে করুণা কারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানটি হবে দয়ালু বা দানশীল। আর যদি কর্তব্য পালন হয় তাহলে সমাজের কাছে কর্তব্য পালনকারী ব্যক্তি হবে কর্তব্য পরায়ন। কিন্তু এটি পালন করা না করা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠানগত, বাধ্য নয়। কিন্তু যদি গৃহীত পদক্ষেপ গুলি দায়িত্ব হয় তাহলে তা পালন করতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাধ্য। এবং সেই দায়িত্ব যদি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে থাকে অপর কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তাহলে তারা দায়িত্ব প্রেরণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়বদ্ধ।উদাহরণস্বরূপ জনগণ, সংবিধান, লোকসভা। দাম্ভিকতা, ক্ষমতা ও বল প্রয়োগ করে সেসব থেকে সরে দাঁড়ালে আলাদা বিষয়।

‘মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন, মজুর মহাজন, নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির হাত ধরে শ্রমিক আন্দোলন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিল। অতএব স্বাধীনতার ইতিহাসে তাদের স্বার্থ ত্যাগ ও অবদান ভোলার নয়।’

 

বর্তমানে পুঁজিপতি ও শিল্পপতিগন যদি মনে করে থাকেন যে তারা করুণা করছেন তা কতটা ‘নৈতিক চিন্তা’ ভেবে দেখা উচিত। কারণ ভারতীয় স্বাধীনতার ইতিহাসে শ্রমিক আন্দোলনের ভূমিকা কিছু কম ছিল না। মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন,  মজুর মহাজন, নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির হাত ধরে শ্রমিক আন্দোলন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিল। অতএব স্বাধীনতার ইতিহাসে তাদের স্বার্থ ত্যাগ ও অবদান ভোলার নয়। এছাড়া সংবিধানের যৌথ তালিকায় অবস্থিত লেবার বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্র সরকার ও রাজ্য সরকার আইন প্রণয়নের সাথে কেন্দ্র সরকার অবসরকালীন পেনশন প্রকল্প চালু করেছে। কোন রাজ্যের অন্য কোন প্রকল্প আছে কিনা আমার জানা নেই। তবে কোনো মহামারী অতিমারী কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যে তাদের মৃত্যুমুখী করতে পারে এটা জেনেও অক্লান্তভাবে ভারত গড়ার কাজ করে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে সেই সকল লড়াকু শ্রমিকদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে করুণা নাকি কর্তব্য পালন নির্ভর করছে সহৃদয় পুঁজিপতি ও শিল্পপতিদের ওপর।

 

বিশ্বের সর্ববৃহৎ লিখিত সংবিধান ও গণতান্ত্রিক দেশ আমার ভারত বর্ষ। যার প্রস্তাবনায় উল্লেখ আছে প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিক পদমর্যাদা ও সুযোগের সমতা পাবে। তাতে উল্লিখিত তিন প্রকার সাম্য তথা সামাজিক রাজনৈতিক এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সাম্যের কথা উল্লেখ আছে এই সমতা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব কার সেটা বলে দিতে হয় না। আবার সংবিধানের চতুর্থ অধ্যায় রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতি সমূহের ৪৩ নম্বর ধারায় উল্লিখিত মজুরি বিষয়ক বিষয়টি হলো জনসাধারণের উপযুক্ত মজুরি প্রদান ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা রাষ্ট্রের করণীয়, এর দায়িত্বটা কার সেটা বলে দেওয়ার প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না। এছাড়া বিভিন্ন আইন যেমন চুক্তি শ্রম আইন  ১৯৭৬ ও ইন্টারস্টেট মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার এক্ট ১৯৭৯ উল্লেখযোগ্য।  সুতরাং রাষ্ট্র যদি মনে করে তাদের উপর করুণা করছে তাহলে রাষ্ট্র হয়তো দায়িত্ব থেকে সরে আসতে চাইছে।

‘উদ্বৃত্ত সম্পদ হস্তান্তর না ঘটিয়ে উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলি অথবা ওই দেশের ব্যক্তিবর্গ দরিদ্র ব্যক্তিদের যথার্থ পুষ্টি না দিয়ে তাদের অকালে মরতে দেয় এবং অপরের মৃত্যু দেখা বা মরতে  দেওয়া হত্যার সমতুল্।’

 

এবার আসি ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের চরম দারিদ্র্যের কথায়। আমি এ বিষয়ে যাচ্ছি না যে দারিদ্র্যের প্রকার গুলি কী এবং ব্যাখ্যা কি। তথা আপেক্ষিক দারিদ্রতা নিয়ে কথা না বলে চরম দারিদ্রতার কথাই তুলে ধরি। ভারতের মতো চরম দারিদ্র্য দেশে খাদ্যাভাবে এবং অপুষ্টিজনিত রোগে মারা যায় এমন মানুষের সংখ্যা কম থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তার যে বৃদ্ধি ঘটবে তা প্রত্যাশিত। আর তাতে শ্রমিক কৃষক ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের মানুষ বেশি প্রভাবিত হবে যদিও তার হিসেব করা ঠিক হবে বলে মনে হয় না।

তবে প্রশ্ন হল এই দরিদ্রদের সাহায্য না করা কি নীতিগতভাবে হত্যার সমতুল্য?  প্রাচুর্য ও দারিদ্র্য যদি দুটি বাস্তব ঘটনা হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবে এটা সিদ্ধান্ত করতে হয় যে উদ্বৃত্ত সম্পদ হস্তান্তর না ঘটিয়ে উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলি অথবা ওই দেশের ব্যক্তিবর্গ দরিদ্র ব্যক্তিদের যথার্থ পুষ্টি না দিয়ে তাদের অকালে মরতে দেয় এবং  অপরের মৃত্যু দেখা বা মরতে  দেওয়া হত্যার সমতুল্।  ব্যবহারিক নীতিবিদ্যায় যদিও এই মতবাদ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বহু তর্ক বিতর্ক আছে। সে সব বিষয় না গিয়ে সিদ্ধান্তে একথা বলা যায় যে নৈতিক দারিদ্র্যকে সাহায্য না করা নীতিগতভাবে হত্যার সমতুল্য।

 

ভারতের মতো বহুত্ববাদী ধর্মপ্রাণ দেশে তাই পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশার ছবি কাম্য নয় কারণ প্রত্যেক ধর্মের ধর্মগ্রন্থ নৈতিকতা ও মানবিকতার বন্ধনে বাঁধা। তাছাড়া এই কঠিন মুহুর্তে পরিযায়ী শ্রমিকদের সহযোগিতা করা আমাদের কারো কর্তব্য আবার কারো দায়িত্ব। করুণা করার মত অবহেলা করা নয় সুতরাং এটা তাদের প্রাপ্য হিসাবে দেখলে তৎপরতা বাড়বে বলে আমার মনে হয়।

 

—মতামত সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here