যেদিন তাঁর কারাবাসের আদেশ হয়েছিল, বন্ধ ছিল সমস্ত দোকান-পাট, তিনি রাষ্ট্রগুরু

special article on surendranath banerjee
Image Source: Google
‘ছিপছিপে লম্বা চেহারা, পরনে গ্রীষ্মকালীন কোট প্যান্ট। চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে একবার হাত নাড়লেন সুরেন্দ্রনাথ, ব্রিটিশ বিরোধী স্লোগানে গর্জে উঠল চারিদিক।’

— লিখেছেন- এম. শুভম —

 

বিপিনচন্দ্র পাল তাঁর আত্মজীবনী ‘সত্তর বৎসর’ (Sattar Batshar) এ লিখেছেন, “বাংলাদেশের পেট্রিয়টিজমের অর্থাৎ স্বদেশ ভক্তির গুরু হলেন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়।“  তবে আমরা কোনোদিনই রাষ্ট্রগুরুর দেখানো পথে স্বদেশ প্রেম কে বুঝিনি। আমাদের দেশ প্রেম বিষয়ভিত্তিক এবং খুবই আপেক্ষিক। এই যেমন ধরুন সীমান্ত পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে স্বদেশপ্রেম,  ক্রিকেট ম্যাচে স্বদেশপ্রেম বা সিনেমাহলে জনগণমন বেজে উঠলে।

 

তখন ব্যারিস্টার বা আইসিএস হওয়ার জন্য উচ্চশ্রেণীর বাঙালিদের একটা বড় অংশ বিদেশমুখী। সুরেন্দ্রনাথও আইসিএস হওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। পরীক্ষা দিলেন, পাস করলেন, কিন্তু বয়সের গন্ডগোলের জন্য ডিসকোয়ালিফাই হয়ে গেলেন। তিনি কোর্টে আপিল করলেন। ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশ অবহেলার কথা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। কেসে জিতে ১৮৭১ সালে আবার পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পেলেন এবং পাশ করলেন। বিদেশে বসেই খবর পেলেন তাঁর বাবা মারা গেছেন। তাঁর আত্মজীবনী ‘আ নেশন ইন মেকিং’ (A Nation in Making) এ একটি জায়গায়  লিখেছেন “I won the case but my father died in 20th feb, 1870”। আইসিএস পাস করে ১৮৭১ এ দেশে ফিরলেন সুরেন্দ্রনাথ।

 

Surendranath Banerjee pic
সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি

চাকরিতে যোগ দিলেন, কিন্তু চাকরি খুব বেশি দিন টিকলো না। তার বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া এবং কাজে বিভিন্ন রকম গাফিলতির অভিযোগ আনলেন তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। আবার তিনি কোর্টে আপিল করলেন, কিন্তু এবারে ফিরলেন পরাজিত হয়ে। এরপর বিদ্যাসাগর মহাশয় এর প্রস্তাবে মেট্রোপলিটন স্কুলে শিক্ষকতার কাজে যোগ দিলেন, এখান থেকেই শুরু হলো রাষ্ট্রগুরু হওয়ার যাত্রা। তারপর ক্রমে সিটি কলেজ, স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং প্রেসিডেন্সি ইনস্টিটিউট। একের পর এক বক্তৃতায় ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে ভারতীয় যুব সমাজকে উঠে দাঁড়াবার সাহস জুগিয়েছিলেন তিনি।

 

যেদিন তাঁকে কোর্টে আনা হলো, কলকাতা হাইকোর্টের সামনে জনসমুদ্র-

২৬ জুলাই ১৮৭৬ ভারতীয়দের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য প্রথম সাংগঠনিক দল ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ তৈরি করলেন। ‘বেঙ্গলি’ (Bengalee) পত্রিকায় ব্রিটিশবিরোধী লেখালেখি শুরু করলেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ সরকার গ্রেফতার করল তাঁকে।

 

যেদিন তাঁকে কোর্টে আনা হলো, কলকাতা হাইকোর্টের সামনে জনসমুদ্র। চারিদিকে স্লোগান উঠছে ‘গো হেল ব্রিটিশ গভমেন্ট’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘উই স্ট্যান্ড ফর সুরেন ব্যানার্জি’। সবথেকে সামনে দাঁড়িয়ে যে ছেলেটি তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সুরেন্দ্রনাথ তাকে খুব ভাল করে চিনতেন। তিনি ‘আশুতোষ মুখার্জী’। পরে ভারতবাসী যাকে চিনেছিল বাংলার বাঘ নামে।

 

ছড়িয়ে পড়লো জাতীয়তাবাদের আগুন। জেল থেকে বেরিয়ে সুরেন্দ্রনাথ গোটা ভারত বর্ষ ঘুরেছিলেন। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় সংগঠন করেছিলেন তিনি। যেদিন তাঁর কারাবাসের আদেশ হয়েছিল, সেদিন সমস্ত দোকান বাজার বন্ধ ছিল। সেদিন বাংলায় সরাসরি বিদেশি দের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের রূপরেখা তৈরী হয়ে গিয়েছিল। ছাত্ররা দারুণভাবে আকৃষ্ট ছিল তার প্রতি, তিনি রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি।

 

—আউটলাইন বাংলা, বিশেষ নিবন্ধ