Tuesday, January 19, 2021
Home অন্য ব্লগ হিন্দি সিনেমার জগতে ‘ট্র্যাজেডি কুইন’, নতুন প্রজন্ম কি জানে এই জনপ্রিয় অভিনেত্রীর...

হিন্দি সিনেমার জগতে ‘ট্র্যাজেডি কুইন’, নতুন প্রজন্ম কি জানে এই জনপ্রিয় অভিনেত্রীর কথা?

১৯৬২ সালে ‘Sahib Bibi Aur Ghulam’ ছবিতে মীনা কুমারীর অনবদ্য অভিনয় এখনও পর্যন্ত হিন্দি সিনেমার সেরা পারফরম্যান্স হিসাবে বিবেচিত। জীবনে বিভিন্ন টানা-পড়েন থাকা সত্ত্বেও সিনেমা জগতে জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

— লিখেছেন- সুকান্ত সাঁতরা —

 

“মীনা কুমারীর মতো মানুষরা প্যারাডক্স হয়। আমরা তাদের বোঝার চেষ্টা করি, তাদের সমালোচনা করি, তাদের প্রশংসা করি। তবে তারা প্যারাডক্সই রয়ে গেছেন” — জাভেদ আক্তার–

হিন্দি সিনেমার জগতে ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ (Tragedy Queen ) হিসাবে পরিচিত জনপ্রিয় অভিনেত্রী মীনা কুমারী (Meena Kumari)। তবে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি একজন কবি হিসাবেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৩৩ সালে ১ লা আগস্ট অর্থাৎ আজকের দিনে বোম্বেতে জন্মগ্রহন করেছিলেন মেহজাবিন বানু, ওরফে মীনা কুমারী (Meena Kumari)। মীনা কুমারী ছোটো থেকেই থিয়েটার শিল্পীদের ছত্রছায়ায় বড় হয়ে ওঠেন। মাত্র ৭ বছর বয়স থেকেই চলচিত্রে কাজ শুরু করে ছিলেন মীনা কুমারী (Meena Kumari) এবং সেই সময় তিনি ‘বেবী মীনা’ নামে পরিচিত ছিলেন। বাবা আলী বক্স একজন প্রবীণ পার্সি থিয়েটার শিল্পী এবং তাঁর মা ইকবাল বেগম একজন নৃত্যশিল্পী ছিলেন। তবে আজকের যুব সমাজ হয়তো মীনা কুমারী (Meena Kumari) নামটার সাথে খুব বেশি পরিচিত নয়, খুব কম মানুষই তাঁর জীবন সম্পর্কে জানেন।

 

meena kumati in movie Yahudi
মীনা কুমারী

বেবী মীনা প্রথমবার ১৯৩৯ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক বিজয় ভট্টের ‘ফারজাদ-ই-হিন্দ’  ছবিতে অভিনয় করেন। এরপর তিনি লালা হাভেলি, অন্নপূর্ণা, সানাম, তামাসা এছাড়াও একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। তবে তাঁর প্রথম মুখ্য ভূমিকা ১৯৪৪ সালে ‘বাচ্চো কা খেল’ ছবি থেকে শুরু হয়। এবং ১৯৫২ সালে ‘বৈজু বাউরা’ ছবিতে অভিনয় করার পর থেকে মিনা কুমারি জনপ্রিয় তারকায় পরিণত হয়েছিলেন, এবং জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। মাত্র ৩৯ বছরের কেরিয়ারে মীনা কুমারী তাঁর নিপুন অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে নিজেকে যেভাবে সিনেমার পর্দায় উপস্থাপিত করেছে তাতে তাঁর দক্ষতাকে অনেকেই অতুলনীয় হিসাবে বিবেচনা করেছেন।

 

প্রেম থেকে বিবাহিত জীবন প্রথম দিকে সুখময় হলেও কয়েক বছরের মধ্যে অশান্তির ছায়া নেমে এসেছিল তাঁর জীবনে।

মীনা কুমারী চলচ্চিত্র পরিচালক ‘কামাল আমরোহি’ কে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন। জানা যায় ১৯৫১ সালে তমশা চলচ্চিত্রের সেটে বিখ্যাত পরিচালকের  সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল তাঁর। পরে কামাল আমরোহির তাঁর ছবি ‘আনারকলি’তে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অভিনয়ের জন্যও সম্মতি দিয়েছিলেন মীনা কুমারী, যার ফলে দুজনেই একে অপরের খুব কাছে এসেছিলেন। ১৯৫২ সালে ‘বৈজু বাউরা’ ছবিটি প্রকাশের পরেই ১৪ ফেব্রুয়ারি মীনা ও কামাল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে তাদের বিবাহের ব্যপারে মীনা তাঁর বাবাকে কিছুই জানাননি। তাদের বিবাহের খবর কেবলমাত্র তাদের খুব কাছের বন্ধুরা জানত। জানা যায় মীনা তাঁর বিয়ের পর নিজের বাড়িতেই থাকতেন।

 

বিয়ের খবর জানার পর তাঁর বাবা দুটি শর্ত দিয়েছিলেন মীনা কে, বলেছিলেন হয় ওই ছবিতে অভিনয় করা ছেড়ে দাও, না হয় এই বাড়ি ছেড়ে দাও। তবে মীনা কুমারী তাঁর বাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলেন।

meena with husband amirohi shooting monent
মীনা কুমারী এবং কামাল আমরোহি

বেশ কিছু দিনের মধ্যে তাদের বিবাহের খবর মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসতেই তাঁর বাবাও জানতে পারেন, এবং তাদের বিয়ে মেনে নিতে পারেনি কারন তদের বয়সের পার্থক্য ছিল অনেকটাই। তখন মীনা সবে মাত্র ১৯ ও কামাল আমরোহি ৩৪। শুধু তাই নয় কামাল আমরোহি আগেও একটি বিয়ে করেছিলেন এবং তাঁর তিনটি সন্তান ছিল। এটি তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে। এই কারনে তৎক্ষণাৎ মীনাকে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে বলেন। এই দো-টানা পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৫৩ সালে “ডেরা” নামক একটি ছবিতে মীনাকে অভিনয় করার জন্য আবেদন জানান কামাল, কিন্তু মীনার বাবা জানার পর মীনাকে অভিনয় করতে দেয়নি। পরে মীনা ‘ডেরা’ ছবির শুটিং-এ অভিনয় করেছিলেন। তবে এই খবর জানার পর তাঁর বাবা দুটি শর্ত দিয়েছিলেন মীনা কে, বলেছিলেন হয় ওই ছবিতে অভিনয় করা ছেড়ে দাও, না হয় এই বাড়ি ছেড়ে দাও। তবে মীনা তাঁর বাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং সেই দিনই তাঁর স্বামি কামাল আমরোহির বাড়ি চলে আসেন।

 

স্বামির বাড়ি এসে ভেবেছিলেন এবার হয়তো সমস্ত রকম পরাধীনতার হাত থেকে মুক্তি পাবেন। জীবনটা নিজের ছন্দে চলবে। কিন্তু কোনো সুরহা হয়নি তাঁর জীবনে, কারন তাঁর স্বামী কামাল আমরোহি বিভিন্ন নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে ফেলেছিলেন তাঁকে। তিনি বিভিন্ন শর্তে ছবিতে কাজ করতে দিতেন, যেমন বাইরে বেরোলে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ এর মধ্যে বাড়ি ফিরতে হবে, তিনি যে গাড়ি দিয়েছিলেন কেবল মাত্র সেই গাড়িতেই তাকে যাওয়া-আসা করতে হবে। শুধু তাই নয় তিনি বলেছিলেন তাঁর শুটিং এর মেক-আপ রুমে কোনো পুরুষ থাকা চলবে না। এই সমস্ত বিধিনিষেধের কারনে মীনা কুমারী হতাশগ্রস্ত হয়েছিলেন, এবং সময়ের সাথে সাথে তাদের সম্পর্কে তিক্ততা এসে গিয়েছিল। এই ঘটনার পর অবশেষে, ১৯৬৪ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। মীনা কুমারীর জীবন বিভিন্ন ধরণের ট্র্যাজেডিতে ভরা ছিল, এ কারণে তিনি ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ নামে পরিচিত ছিলেন।

 

মীনা কুমারি তখন হিন্দি সিনেমার জগতে জনপ্রিয় অভিনেত্রী, তখন সবে মাত্র ধর্মেন্দ্র তার অভিনয় ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই শুরু করেছেন।

ধর্মেন্দ্র এবং মীনা কুমারী ছবির একটি দৃশ্য

জানা যায় বিবাহ বিচ্ছেদের পর ধর্মেন্দ্রর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে শুরু করে। ধর্মেন্দ্রর জনপ্রিয়তার কারন অনেকটা মিনা কুমারী। তিনি ধর্মেন্দ্রর অভিনয় জীবনেকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য অনেক সহযোগিতা করেছিলেন। এই কারনেই  জাভেদ আক্তার একবার মীনা কুমারীর সম্পর্কে বলেছিলেন, “মীনা কুমারীর মতো মানুষরা প্যারাডক্স হয়। আমরা তাদের বোঝার চেষ্টা করি, তাদের প্রশংসা করি, তাদের সমালোচনা করি। তবে তারা প্যারাডক্সে রয়ে গেছেন।

১৯৬২ সালে সাহেব বিবি অর গোলাম (Sahib Bibi Aur Ghulam) ছবিতে অনবদ্য অভিনয় এখনও পর্যন্ত হিন্দি সিনেমার সেরা পারফরম্যান্স হিসাবে বিবেচিত। ১৯৬৩ সালে মীনা কুমারী অভিনিত তিনটি ছবি ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রী বিভাগের জন্য মনোনীত হয়েছিল। তিনটি ছবি হল সাহেব বিবি আর গোলাম (Sahib Bibi Aur Ghulam), আরতি (Aarti) ও মে চুপ রাহুঙ্গি ( Main Chup Rahungi)। তবে তিনি কেবল মাত্র  সাহেব বিবি অর গোলামের (Sahib Bibi Aur Ghulam) জন্য পুরষ্কার পেয়েছিলেন।

 

মীনা কুমারীর জীবন বিভিন্ন ধরণের ট্র্যাজেডিতে ভরা ছিল, এ কারণে তিনি ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ নামে পরিচিত ছিলেন।

Meena kumari baju bala cinema
মীনা কুমারী, পুরনো ছবি

১৯৬৮ সালে মীনা কুমারীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। প্রতিনিয়ত মদ্যপানের ফলে তাঁর লিভার সিরোসিস (liver cirrhosis) সৃষ্টি হয়। তিনি নিজের চিকিৎসার জন্য লন্ডন এবং সুইজারল্যান্ডে গিয়েছিলে। সুস্থ হয়ে উঠতেই দেশে ফিরে পুনরায় কাজ শুরু করেন। কমল আমরোহির ছবি ‘পাকিজা’ (Pakeezah) ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন। ‘পাকিজা’ (Pakeezah) ছবি মুক্তি পাবার কয়েক সপ্তাহ পর ফের অসুস্থ হয়ে পরেন মীনা কুমারী। এবং ১৯৭২ সালে ৩১ মার্চ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি মাত্র ৩৯ বছরের কেরিয়ারে অভিনেতা দিলীপ কুমার, রাজেন্দ্র কুমার, অশোক কুমার, দেব আনন্দ , ধর্মেন্দ্র প্রমুখের সাথে কাজ করেছেন। জনপ্রিয় অভিনেত্রী মীনা কুমারীর মৃত্যুর পরে তাঁর জীবনের কাহিনী নিয়ে লেখা প্রথম বইটি ছিল ‘মীনা কুমারী – দ্য ক্লাসিক বায়োগ্রাফি’ (Meena Kumari – The Classic Biography)। মীনা কুমারীকে নিয়ে লেখা এই বইটি ১৯৭২ সালে লেখা হয়েছিল। এই বইটি লিখেছিলেন বিনোদ মেহতা (Vinod, Mehta)। এছাড়াও মীনা কুমারীর জীবনের কাহিনী নিয়ে লেখা আরও অনেক বই রয়েছে।

 

—আউটলাইন বাংলা, বিশেষ নিবন্ধ

Most Popular