Homeব্লগKishore Kumar: আভাস কুমার গাঙ্গুলি থেকে কিশোর কুমার, স্নেহের কিশোর দা

Kishore Kumar: আভাস কুমার গাঙ্গুলি থেকে কিশোর কুমার, স্নেহের কিশোর দা

‘আজও বাঙালি আবেগের অন্য নাম কিশোর কুমার। আভাস কুমার গাঙ্গুলি (Abhas Kumar Ganguly) থেকে পরবর্তীকালে কিশোর কুমার নামে (Kishore Kumar) পরিচিতি, অনেকের কাছেই স্নেহের কিশোর দা। ব্যক্তিগত জীবন খুব একটা শান্তিপূর্ণ না হলেও, তাঁর কৃতিত্বের কথা আলাদা করে বলতে হয় না বাঙালিকে।’

— লিখেছেন- সুকান্ত সাঁতরা —

 

সুরেলা কণ্ঠে যিনি সঙ্গীত জগতকে মাতোয়ারা করে রেখেছেন, যার গান আজও সমানভাবে জনপ্রিয়, ছোটো থেকে বড় সকলেই গুন গুন করে গেয়ে চলে তাঁর গান, তিনি ভারতের সর্বকালীন খ্যাতিসম্পন্ন গায়ক ‘আভাস কুমার গাঙ্গুলি’ ওরফে  ‘কিশোর কুমার’ (Kishore Kumar)। তবে গায়কের পাশাপাশি তিনি একজন সফল ভারতীয় অভিনেতা, প্লেব্যাক গায়ক, সুরকার, এবং সঙ্গিত পরিচালক। এই জনপ্রিয় গায়ক আজকের দিনে মধ্যপ্রদেশের খান্ডোবাতে বাঙালি ‘গাঙ্গুলী’ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সাল ১৯২৯, ৪ আগস্ট। পিতা কুঞ্জিলাল গাঙ্গুলী  ছিলেন আইনজীবী। দুই ভাই, অশোক কুমার ও অনুপ কুমার ছাড়াও সতী নামে এক ছোট বোন ছিল, তবে পরিবারে তিনিই সবথেকে ছোটো সদস্য ছিলেন। আভাস কুমার গাঙ্গুলি (Abhas Kumar Ganguly) থেকে পরবর্তীকালে কিশোর কুমার নামে পরিচিতি। তবে অনেকের কাছেই স্নেহের কিশোর দা।

 

কিশোর কুমারের (Kishore Kumar) গাওয়া গান গুলিতে রয়েছে রোমান্স ও আবেগে ভরপুর মিশ্রণ,

তাই আজও বাঙালি আবেগের অন্য নাম কিশোর কুমার (Kishore Kumar)। প্রতিটি মহান মানুষই নানা রকম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন, তেমনই কিশোর কুমারও নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

kishor kumar with satyajit roy
স্টুডিওতে সত্যজিতের সঙ্গে কিশোর কুমার

প্রথম থেকেই তিনি অন্যকে নকল করে জন সমক্ষে দেখানো খুব পছন্দ করতেন। তবে নকল করলেও অভিনয় করতে পছন্দ করতেন না। তিনি সবসময় চাইতেন গান গাইতে। সেক্ষেত্রে ধরা বাঁধা শিক্ষায় গান শেখা হয়ে ওঠেনি তাঁর। কিশোরের এই ছোটো ছোটো প্রতিভা গুলিকে কাজে লাগিয়েছিল তাঁর বড় ভাই অশোক কুমার। সেই সময়ে অশোক কুমার বোম্বেতে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে বড় সাফল্য পেয়েছিলেন এবং সময়ের সাথে সাথে জনপ্রিয় অভিনেতা হয়ে ওঠেন। ফলে কিশোর অল্প বয়স থেকেই বোম্বে টকিজ-এ কোরাস গায়ক হিসাবে তার বলিউডে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন।

সেখানে সেইসময়ে তাঁর বড় ভাই অশোক কুমারও কাজ করতেন। প্রথমদিকে ‘কুন্দন লাল সায়গলের’ কণ্ঠ নকল করে গান গাইতেন কিশোর কুমার। তবে পরবর্তী সময়ে শচীন দেব বর্মনের সাথে সাক্ষাৎ হবার পর তারই পরমর্শে তিনি নিজের কণ্ঠে এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব ভঙ্গিমায় গান গাইতে শুরু করেন, যা সেই সময়ের জনপ্রিয় দুই গায়ক মহম্মদ রফি এবং মুকেশের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মী হয়ে ওঠে।

 

অভিনেতা এবং গায়ক-

কিশোর কুমার প্রথম ‘জিদ্দি’ (১৯৪৮) চলচ্চিত্রের জন্য একটি গান গেয়েছিলেন। এরপর তিনি ১৯৫১ সালে হিন্দি চলচিত্র জগতে ‘আন্দোলন’ (১৯৫১), ‘নওকরী’ (১৯৫৪) এবং ‘মুসাফির’ (১৯৫৭), ‘চলতি কা নাম গাড়ি’ (১৯৫৮) এই ছবি গুলিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন। এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বলা চলে পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে সবচেয়ে ব্যস্ত, সফল নায়ক এবং গায়ক ছিলেন কিশোর কুমার।

kishor kumar with asha bhosle rare pic
কিশোর কুমার এবং আশা ভোঁসলে

তবে ষাটের (৬০) দশক শুরুর পরবর্তী সময় থেকেই কিশোর কুমারের অভিনীত সিনেমা গুলি ব্যবসায়িকভাবে অসফল হয়ে পড়ে এবং তখন থেকেই কিশোর কুমার পাকাপাকি ভাবে গানের গাওয়ার প্রতি মননিবেশ করেন। ১৯৬২ সালে ‘মুনিমজি’, ১৯৬৫ ‘গাইড’, ১৯৬৭ ‘জুয়েল থিফ’  চলচিত্রে গাওয়া গান গুলি ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর পরই ১৯৬৯ সালে ‘আরধনা’  ছবি টি মুক্তি পায়, এই ছবির জন্য কিশোর কুমার মোট তিনটি গান গেয়েছিল ‘কোরা কাগজ থা ইয়ে মন মেরা’ লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে, বাকি দুটি গান ‘রূপ তেরা মস্তানা’ এবং ‘মেরে সপনো কি রানী’ সেই সময়ে এই তিনটি গান জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে যায়।

৬০এর দশকে হিন্দি সিনেমায় উঠতি নায়ক রাজেশ খান্না, শশী কাপুর, ধর্মেন্দ্র, রণধীর কাপুর, সঞ্জীব কুমার এবং দেব আনন্দের জন্য তিনি প্রচুর গান গেয়েছিলেন। অবাক করা বিষয় হল ‘হাফ টিকিট’ (১৯৬২) সিনেমাতে ‘আকাশে লাগি দিল দিল পে’ গানটিতে তিনি নিজেই পুরুষ ও মহিলা উভয় কন্ঠে গেয়েছিলেন। তিনি শুধু মাত্র হিন্দি গান নয় তিনি অনেক বাংলা গান গেয়েছেন।  তাঁর গাওয়া কিছু জনপ্রিয় বাংলা গান হল, আমার মনের এই ময়ূর মহলে, এই যে নদী, এই তো জীবন, হাওয়া মেঘ সরায়ে, কি আশায় বাঁধি খেলাঘর, এক পলকের একটু দেখা।

 

কিশোর কুমার খুব মজাদার স্বভাবের ছিলেন-

একদিন কিশোর কুমার ও লতা মঙ্গেশকরের ডুয়েট গান রেকর্ডিংয়ের সময় সকলেই কানে হেডফোন লাগিয়ে বসে আছেন। নির্দিষ্ট সময়ে গান শুরু হয়েছে, কিশোর কুমার নিজের অংশটুকু গেয়ে রেকর্ডিং রুমের মধ্যেই নানান অঙ্গভঙ্গি করে নাচা-নাচি শুরু করে দেন, ফলে লতা মঙ্গেশকর গান গাওয়ার সময় বেশ কয়েকবার হেঁসে ফেলেছিলেন, এবং তাকে দেখে কোনো ভাবেই হাঁসি বন্ধ করতে পারেননি ।

আরেকটি ঘটনা, শোলে ছবির ‘মেহবুবা ও মেহবুবা’ জনপ্রিয় গানটি কিশোর কুমারের কণ্ঠে গাওয়ার কথা ছিল, তবে শচীন দেব বর্মনের কথা ও সুর অনুযায়ী কিশোর কুমার গেয়ে উঠতে পারেনি।  হঠাৎ কিশোর কুমার শচীন দেব বর্মন কে বললেন “আমার থেকে তুমি খুব ভালো গানটা গেয়ে শুনিয়েছ, তাই এটা তুমিই গেয়ে দাও।“

কোনো কনসার্টে যাওয়ার আগে তিনি মঞ্চের সঠিক মাপ জেনে নিতেন, মঞ্চ ছোটো হলে জানিয়ে দিতেন আমার জন্য বড় মঞ্চ লাগবে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিতেন আমি নেচে নেচে গান করি তাই ছোটো মঞ্চ হলে অসুবিধা হবে।

আরেকটি মজার বিষয় হল,কিশোর কুমার সেভাবে হারমোনিয়াম বাজাতে পারতেন না। তাই গান গাওয়ার সময় যে জায়গায় বাজাতে অসুবিধা হত, সেখানে হারমোনিয়াম বাজানো বন্ধ করে খালি গলায় গান গেয়ে দিতেন।

 

তবে কিশোর কুমারের ব্যক্তিগত জীবন ছিল খুব অশান্তিপূর্ণ-

তিনি চারবার বিয়ে করেছিলেন। প্রথম বিবাহ করেছিলেন ১৯৫০ সালে অভিনেত্রী তথা গায়িকা রুমা গুহঠাকুরতা কে, এই বিবাহ ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এবং তারপরই তাঁরা বিবাহ বিচ্ছেদ করে নেন। দ্বিতীয় বিবাহ করেছিলেন ১৯৬০ সালে অভিনেত্রী মধুবালা কে। এই বিবাহ ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। তৃতীয় বিবাহ করেছিলেন ১৯৭৫ সালে জনপ্রিয় অভিনেত্রী যোগিতা বালী কে।

kishor kumar with yogita bali rare pic
কিশোর কুমার এবং যোগিতা বালী

যোগিতা বালী ৭০-৮০ র দশকের তাঁর জনপ্রিয় অভিনয়ে সকলকে মুগ্ধ করেছিলে, সাথে সাথে তাঁর রুপের সৌন্দর্য অনেক মানুষের মন চুরি করেছিল। যোগিতা বালী কিশোর কুমারের সাথে অনেক ছবিতে অভিনয় করেছিলেন, কাজ করার সময় একে অপরের প্রেমে পরে বিবাহ করেছিলেন। তবে এই বিবাহ ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। চতুর্থ বিবাহ করেছিলেন ১৯৮০ সালে লীনা চন্দাভারকর-এর সাথে। এই বিবাহটিও ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।

কিশোর কুমারের চার বারের বিবাহিতজিবনে মোট দুটি সন্তান, বড় ছেলে অমিত কুমার ছিলেন রুমা গুহ ঠাকুরতা এবং ছোট ছেলে সুমিত কুমার ছিলেন লীনা চন্দাভারকরের সন্তান।

 

তাঁর কৃতিত্বের কথা আলাদা করে বলতে হয় না। কিশোর কুমার সেরা পুরুষ প্লেব্যাক সিঙ্গারের জন্য সর্বাধিক সংখ্যক ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড ট্রফি জয়ের রেকর্ড করেছিলেন। ‘রূপ তেরা মস্তানা’ গানের জন্য কিশোর প্রথম বার শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান। ১৯৮৭ সালে ১৩ অক্টোবর ৫৮ বছর বয়সে জনপ্রিয় গায়ক কিশোর কুমারের হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়। কিশোর কুমার তাঁর মৃত্যুর আগের দিন অর্থ্যাৎ ১২ই অক্টোবর গান রেকর্ড করেছিলেন। তিনি আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর অনবদ্য রোমান্স ও আবেগে ভরা গান গুলি শুনলে আজও আমরা ভাবি, তিনি কি সত্যিই আমাদের মধ্যে নেই?

 

—আউটলাইন বাংলা, বিশেষ নিবন্ধ

এই মুহূর্তে