‘যদি একটু সময় দিতেন সকল ভারতবাসীকে বোম বাঁধা শিখিয়ে দিতাম’, ক্ষুদিরাম বসু

how plant bombs special article on khudiram bose
Image: Google

অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের হাজারো দুঃসাহস নিয়ে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পরিপূর্ণ। ওই বিপ্লবীদের মধ্যে ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ মহান মুক্তিযোদ্ধা ক্ষুদিরাম বসু। যিনি ভারতে ব্রিটিশ রাজের বিরোধিতা করেছিলেন। কেবল মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের জন্য ফাঁসিতে চরেছিলেন তিনি। আজ সেই সর্বকনিষ্ঠতম বিপ্লবী দেশপ্রেমিক ক্ষুদিরাম বসুর ১৩১ তম জন্মবার্ষিকী।

— আউটলাইন বাংলা ডেস্ক

১৮৩৯ সালের ৩ ডিসেম্বর নাড়াজোলের তহসিলদার ট্রয়লোক্যনাথ বসুর ছেলে ক্ষুদিরাম বসু জন্মগ্রহণ করেন বাংলার মেদিনীপুর জেলার হাবিবপুর গ্রামে। পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান ছিলেন তিনি। ক্ষুদিরামের জন্মের আগে তাঁর পিতা মাতার দুই পুত্র সন্তান থাকলেও দুই পুত্রেরই অকাল মৃত্যু হয়েছিল, তাই ক্ষুদিরামের অকাল মৃত্যুর আশঙ্কায় তাঁর মা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী তখনকার সমাজিক প্রথা অনুযায়ী তাঁর পুত্র ক্ষুদিরাম কে বড়ো দিদির কাছে তিন মুঠো খুদের বিনিময়ে বিক্রি করেছিলেন। সেই থেকেই ক্ষুদিরাম।

বিপ্লবী কর্মকাণ্ডঃ

ক্ষুদিরাম বসু শৈশবকাল থেকেই সেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি যখন নবম শ্রেণিতে পড়ছিলেন সেই সময় তাঁর মনে হয়েছিল দেশকে ব্রিটিশ রাজের দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে হবে, তারপর তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলেন। সাল ১৯০২-০৩, বিপ্লবী নেতা শ্রী অরবিন্দ ও সিস্টার-নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করেন এবং জনসম্মুখে বক্তব্য রাখেন। সেই সময়ে বিভিন্ন বিপ্লবী দলগুলোর সাথে গোপনে পরিকল্পনা করেন, ঠিক তখনই ক্ষুদিরাম বসু বিপ্লবে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত হন। স্কুল ছেড়ে তিনি ‘যুগান্তর’ নামে এক রাজনৈতিক বিপ্লবী দলে যোগদান করেন। এবং রাজনৈতিক নিষিদ্ধ পত্র-পত্রিকা বিলি করেন।

১৯০৫ সালে ক্ষুদিরাম বসু বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। এ সময় ক্ষুদিরাম বসু সত্যেন বসুর নেতৃত্বে গুপ্ত সংগঠনে যোগ দেন। এবং একাধিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সাহসিকতা বিচক্ষণতার পরিচয় দেন, এর ফলে একাধিক সংগঠন গুলিতে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। বিপ্লবী দলের অর্থের প্রয়োজনে ক্ষুদিরাম বসু এক ডাকহরকরার কাছ থেকে মেইলব্যাগ ছিনিয়ে নেন। ওই সময় কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতা মামলায় কঠোর শাস্তি দেবার জন্য তৈরি হন। তবে বিপ্লবীরা পাল্টা সিদ্ধান্ত নেন কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করার। এই দায়িত্ব স্বয়ং ক্ষুদিরাম বসুর ওপর ছিল।
special article on khudiram bose
তবে ক্ষুদিরাম বসুকে এই বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য রংপুরের আরেক যুবক বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীকে যুক্ত করা হয়। এই খবর গয়েন্দারা পাওয়া মাত্রই মজফফরপুরে বদলি করা হয় ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে। ক্ষুদিরাম বসু ও তাঁর সহযোগী বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী এই খবর পেয়ে রওনা দেয় মজফফরপুরে। সেখানে পৌঁছে কয়েকদিন কিংসফোর্ডের গতিবিধি লক্ষ করতে থাকেন। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল দুই বিপ্লবী প্রস্তুত ছিলেন বোম হাতে নিয়ে। ঠিক রাত ৮ টায় প্রচণ্ড শব্দে একটি বোমা বিস্ফোরিত হলো। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল তাঁরা। ওই বিস্ফোরণে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড বেঁচে যায়, পরিবর্তে ওই ঘটনাস্থলে মারা যান কেনেডির স্ত্রী ও তাঁর মেয়ে। হামলার পরে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল পালাতে সক্ষম হন। কিন্তু পরদিন ক্ষুদিরাম বসু ওয়াইসি রেলস্টেশনে থেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন। এদিকে প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা পড়তেই দ্রুত নিজের পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা করেন।

এরপর ফাঁসির রায় দেওয়া হয় সর্বকনিষ্ঠতম বিপ্লবী দেশপ্রেমিক ক্ষুদিরাম বসুর।

বিচারক কর্নডফের এমন রায় শোনার পরে ক্ষুদিরাম হেসে ছিলেন। সেই সময় বিচারক ক্ষুদিরামকে প্রশ্ন করেন, ওই ফাঁসিতে তাঁকে মরতে হবে সেটা সে বুঝতে পেরেছে কিনা? ঠিক ওই সময় ক্ষুদিরাম বলেছিলেন, “আমাকে যদি একটু সময় দিতেন তাহলে আমি সকল ভারতবাসীকে শিখিয়ে দিতাম কি করে বোম বানাতে হয়। কারন আমি খুব ভালো বোম বানাতে পাড়ি।“ এর পর ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট সর্বকনিষ্ঠতম মহান মুক্তিযোদ্ধা ক্ষুদিরাম বসুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ভারতে ব্রিটিশ রাজের বিরোধিতা আন্দোলনে ক্ষুদিরাম বসু হাসি মুখে ফাঁসীর মঞ্চে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা লাভের জন্য কয়েকধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশপ্রেমিক কিংবদন্তি-মহানায়ক। তাঁর বিপ্লবী চেতনাধারা আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণার উৎস।