Homeতথ্যমুলকAlexander the great: মহান দিগ্বিজয়ীর আড়ালে এক অজ্ঞাত দার্শনিক

Alexander the great: মহান দিগ্বিজয়ীর আড়ালে এক অজ্ঞাত দার্শনিক

ইতিহাস তাঁকে মনে রেখেছে এক মহান দিগ্বিজয়ী হিসেবে। যিনি ইচ্ছাকৃত ভাবেই দুঃসাহসিক জীবন বেছে নিয়েছিলেন। জীবনে কোনো যুদ্ধ তিনি হারেননি। কিন্তু অ্যারিস্টটলের (Aristotle) এই ছাত্র যুদ্ধ ক্ষেত্রেও বহন করতেন হোমারের ইলিয়াডের (Homer’s Iliad) একটি অনুলিপি, যার প্রতি ছেলেবেলা থেকেই ছিল তার বিশেষ আকর্ষণ। তিনি হলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ Alexander the great, মহান আলেকজান্ডার।

তখন বাণিজ্যক কারনে অনেকেই আসতেন রাজার কাছে, হঠাৎ এক ব্যবসায়ী একটি ভালো জাতের ঘোড়া নিয়ে এসে হাজির হলেন ফিলিপের (Philip II) কাছে। ছোট কিন্তু বেশ তেজী। অনেক চেষ্টা করেও কেউ তাকে বাগে আনতে পারছে না। আলেকজান্ডারের (Alexander the great) বয়স তখন সবে ১০ বছর। বিষয়টি তিনি দূরে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। দেখলেন ঘোড়াটি তার নিজের ছায়া দেখে ভয় পাচ্ছে, কাছে গিয়ে নিমেষে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিলেন সূর্যের দিকে, তারপর এক লাফে চড়ে বসলেন ঘোড়ার পিঠে। নাম দিলেন বুসেফেলাস (Bucephalus)। জীবনের শেষ যুদ্ধ পর্যন্ত প্রিয় বুসেফেলাস তাঁর সঙ্গ দিয়েছিল। ভারতে এসে হিদাস্পিসের যুদ্ধে বুসেফেলাস মারা যায় (প্রতিপক্ষ হত্যা করে), বর্তমান পাকিস্তানের জালালপুর সরিফে বুসেফেলাসের সমাধি রয়েছে।

আলেকজান্ডার এবং অ্যারিস্টটল(Alexander and Aristotle ):

১৩ বছর বয়সী সুগঠিত দেহ, হালকা বাদামী রঙের চুল, এই ছেলেটির গনিত, ইতিহাস, ধর্নুবিদ্যা শিক্ষা শুরু হয়েছিল অনেকদিন আগেই। কিন্তু ফিলিপ বুঝলেন এই ছেলেকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য একজন উত্তম শিক্ষকের প্রয়োজন। ডেকে পাঠালেন শ্রেষ্ঠ গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলকে। তিনি এলেন, শিক্ষাদান করতে রাজিও হলেন পরিবর্তে চেয়ে নিলেন স্তাগিরা (Stagira, Central Macedonia, Greece), অর্থাৎ অ্যারিস্টটলের বাড়ী, পুরনো শহর, যেটি ফিলিপ অনেকদিন আগে দখল এবং ধংস করেছিলেন। সেই শহর আবার সাজিয়ে দেওয়া হল, সমস্ত শহরবাসীরা ফিরে এলেন, যারা বন্দি ছিল তাদের মুক্তি দেওয়া হল।

Alexander of Macedon and Aristotle
আলেকজান্ডার এবং অ্যারিস্টটল

অ্যারিস্টটল তাকে নিয়ে গেলেন রাজধানী শহর পেল্লা (Pella, Macedonia) থেকে অনেক দূরে। প্রত্যন্ত, বিচ্ছিন্ন একটি গ্রামে, নাম মিজা (Mieza) । এই নির্জনতার মধ্যেই আলেকজান্ডারের শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছিল। তাঁর পাঠ্যক্রমে প্রধানত কবিতা, অলঙ্কারশাস্ত্র, জ্যামিতি এবং জ্যোতির্বিদ্যার মতো বিষয়গুলি ছিল। তবে অ্যারিস্টটল ওষুধের প্রতি তাঁর একটি বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছিলেন এবং তা নিছক তাত্ত্বিক ছিল না, তার প্রমান হল আলেকজান্ডার তাঁর অসুস্থ বন্ধুদের প্রায়ই চিকিত্সার পরামর্শ দিতেন।

আলেকজান্ডার যখন এশিয়াটিক আক্রমণের (Asiatic invasion) জন্য আসেন, তখন তিনি প্রাণীবিদ এবং উদ্ভিদবিদের একটি বড় দল সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি (Alexander the great) চেয়েছিলেন সংগৃহীত উপকরণ এবং তথ্য নিয়ে ফিরে গিয়ে প্রাণীবিদ এবং উদ্ভিদবিদগন বেশ কিছু যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক কাজের ভিত্তি তৈরি করুক। আলেকজান্ডারের আরেকটি প্রিয় বিষয় ছিল গ্রীক কবিতা। হোমারের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তিনি সবসময় হোমারের ইলিয়াডের (Homer’s Iliad) একটি অনুলিপি বহন করতেন যেটি অ্যারিস্টটলের হাতেই তৈরি ছিল।

আলেকজান্ডার এবং রোক্সান (Alexander and Roxane):

ইতিহাসের মহান রাজা কখনো প্রেমে পরবেন না এমনটা ভাবা ভুল। তাও আবার লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। অক্সিয়ার্টেস নামক এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির কন্যা রোক্সান। যিনি আলেকজান্ডারের আক্রমনের হাত থেকে একটি পর্বত দুর্গ রক্ষার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সেই সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ছিলেন খোদ আলেকজান্ডার। কঠর লড়াই এর পর দুর্গ দখল হল, তখনই তিনি প্রথম রোক্সানকে দেখতে পান এবং প্রেমে পড়েন।

শীঘ্রই বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। রোক্সানকে বিয়ে করলেন তিনি। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হতেই আলেকজান্ডার তার তরবারি দিয়ে একটি রুটি কেটে দু-টুকরো করেন এবং নব-বধূর সাথে ভাগ করে নিয়েছিলেন। রোক্সেন ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভারত অভিযানে তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। রোক্সেনের বিবাহিত জীবন বেশি দিনের ছিল না। রাজার মৃত্যুর পরপরই রোক্সেনার সন্তানের জন্ম দেন (Alexander IV)।

আলেকজান্ডার এবং দিওজেনেস (Alexander and Diogenes):

আলেকজান্ডার এক কুখ্যাত দার্শনিকের সন্ধান পেয়েছিলেন যিনি একটি বড় মাটির পাত্রে ঘুমোতেন। তিনি সমস্ত আড়ম্বর ত্যাগ করেছিলেন এবং বেশিরভাগ সময় উলঙ্গ অবস্থাতেই থাকতেন। রাজ্যের গণ্যমান্য বেক্তি থেকে শুরু করে কবি, দার্শনিক সবাই রাজার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন কিন্তু দিওজেনেস কোনদিন রাজার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি। তাই রাজা একদিন নিজেই গেলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে।

ঘোড়া থেকে নেমে দিওজেনেস এর সম্মুখে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,আমি কি আপনার জন্য কিছু করতে পারি? দিওজেনেস উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, ‘একপাশে সরে দাঁড়ান। আমার ওপর যে সূর্যের আলো পড়ছে তাকে আপনি অবরুদ্ধ করছেন’। আলেকজান্ডার দেখলেন তাঁর ছায়া পড়েছে দিওজেনেসের ওপর, সরে দাঁড়ালেন। এই সাক্ষাৎ তাঁর (Alexander) জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরে তিনি বলেছিলেন, “আমি যদি আলেকজান্ডার না হতাম তবে আমি দিওজেনেস হতাম (If I were not Alexander, I would be Diogenes) ।”

Alexander the great facts and biography
মৃত্যুশয্যায় আলেকজান্ডার

আলেকজান্ডার দি গ্রেট

তাঁর সুদক্ষ কৌশল এবং প্রশিক্ষণ অভিজ্ঞ সেনাবাহিনীকে একটি দক্ষ হত্যার যন্ত্রে পরিণত করেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর ব্যবহৃত কৌশলগুলি আজও সামরিক ক্ষেত্রে অধ্যয়নের বিষয়। তিনি সর্বদা তাঁর সৈন্যদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন। এই মহান দিগ্বিজয়ী মৃত্যুশয্যায় সেনাপতিদের নিজের তিনটি ইচ্ছে পূরণ করার কথা জানিয়েছিলেন বলে শোনা যায়।

(১) কেবল মাত্র চিকিৎসক এবং রাজ বৈদ্যরাই আমার কফিন বহন করবেনঃ মহান আলেকজান্ডার তাঁর চিকিৎসকদের কফিন বহন করার আদেশ দিয়েছিলেন কারন, যাতে প্রজারা অনুধাবন করতে পারে চিকিৎসকরা আসলে কোনো মানুষকে সারিয়ে তুলতে পারেন না। তাঁরা ক্ষমতাহীন, মৃত্যুর থাবা থেকে কাউকে রক্ষা করতে তারা অক্ষম।
(২) আমার কফিন যে পথ দিয়ে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে, সেই পথে কোষাগারে সংরক্ষিত সোনা, রুপা ও অন্যান্য মূল্যবান পাথর ছড়িয়ে দিতে হবেঃ কবরস্থানের পথে সোনা, রুপা ছড়িয়ে রাখার আদেশ দিয়েছিলেন কারন, প্রজারা এটা বুঝতে পারবে যে ওই সোনা, রুপো, মূল্যবান রত্ন কিছুই উনার সঙ্গে যাবে না। উনি যা পাওয়ার জন্য সারা জীবন ব্যয় করেছেন, তা কিছুই নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারছেন না।
(৩) কফিন বহনের সময় আমার দুই হাত কফিনের বাইরে ঝুলিয়ে রাখা হবেঃ কফিনের বাইরে হাত ছড়িয়ে রাখতে বলেছিলেন কারন মানুষ বুঝবে মহান আলেকজান্ডার খালি হাতেই এই পৃথিবীতে এসেছিলেন, আবার খালি হাতেই পৃথিবী থেকে চলে যাচ্ছেন। মানুষ যেভাবে পৃথিবী তে আসে আবার সেভাবেই চলে যায়।

আলেকজান্ডারের জীবনকাল মাত্র ৩৩ বছরের। ১৯ মাস ভারতে থাকার পর ফিরে যাওয়ার সময় ৩২৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনে তাঁর মৃত্যু হয়, মৃত্যুর সঠিক কোন কারন এখনো জানা যায়নি। তিনি বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যের অধিশ্বর হতে চেয়েছিলেন। স্বল্পকালীন জীবনের অর্ধেক সময় তিনি অতিবাহিত করেছেন যুদ্ধেক্ষেত্রে। তার বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য ঐতিহাসিকরা তাকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতির আসনে বসিয়েছেন। তাকে অভিহিত করেছেন আলেকজান্ডার দি গ্রেট (Alexander the great) নামে। নিজের নামে ৬০ টিরও বেশি শহর তিনি স্থাপন করেছিলেন। তবে এর পাশাপাশি তিনি ছিলেন শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক এবং সর্বোপরি একজন দার্শনিক।

লিখেছেন-এম.শুভম

তথ্য সূত্র-
*Alexander the Great: Facts, biography and accomplishments
by Owen Jarus , Jonathan Gordon
*History of Macedonia Alexander of Macedon Biography
by historyofmacedonia.org
*Historyextra,Alexander the Great, historyextra.com
*Facts and Details, Alexander the Great, factsanddetails.com
*The us History by ushistory.org
*Alexander facts by facts.net

এই মুহূর্তে